কাদের অর্থায়নে ইসরায়েল সফরে যান মার্কিন কংগ্রেস নেতারা?

প্রতি বছর ইসরায়েল সফর করে থাকেন মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্য। আট দিনব্যাপী এসব সফরে খরচ হয়ে থাকে লাখ লাখ ডলার। এ আয়োজনের মাধ্যমে মার্কিন কংগ্রেসে ইসরায়েলের পক্ষে সমর্থন জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রভাবশালী লবিং গ্রুপ আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপিএসি)। কংগ্রেস সদস্যদের এসব সফরে কারা অর্থায়ন করে থাকে এ বিষয়ে শনিবার (১৮ নভেম্বর) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন অলাভজনক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্টারসেপ্ট’। প্রতিবেদনে প্রাতিষ্ঠানিক দাতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ বা পারিবারিক দাতাদের নামও রয়েছে।

কংগ্রেস সদস্যদের (প্রতিনিধি ও সিনেটর) ইসরায়েল সফরে ঠিক কে বা কারা অর্থায়ন করে তা এক রহস্যই রয়ে গেছে। এ রহস্যের বেড়াজাল ভেদ করে সেসব ‘গোপন’ দাতাদের নাম উন্মোচন করা এখনও পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। তবে ২০১৯ ট্যাক্স ফাইলিং-এর একটি অসংশোধিত কপি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এআইপিএসি-কে কারা তহবিল দেয় তাদের কয়েকজনের নামের একটি তালিকা পেয়েছে ইন্টারসেপ্ট।

সংবাদমাধ্যমটি বলছে, অসংশোধিত ট্যাক্স নথিতে যেসব অর্থদাতার নাম পাওয়া গেছে তারা মূলত বিভিন্ন বড় বড় ফাউন্ডেশন এবং অলাভজনক সংস্থা। যাদের মধ্যে কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

ইন্টারসেপ্ট আরও জানিয়েছে, ইসরায়েলে মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের এসব সফর ‘আমেরিকান ইসরায়েল এডুকেশন ফান্ড (এআইইএফ)’ নামে একটি মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আয়োজন করা হয়ে থাকে। এআইইএফ হলো এআইপিএসি অধিভুক্ত একটি দাতব্য সংস্থা। অন্যান্য করমুক্ত অলাভজনক সংস্থার মতো এআইইএফ-কেও ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস (আইআরএস)-এর কাছে প্রতি বছর একটি ‘ফর্ম ৯৯০’ নথি দাখিল করতে হয়, যা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা হয়। তবে এই নথিতে দাতাদের নামের তালিকা সংশোধন করে প্রকাশ করা হয়।

আমেরিকান ইসরায়েল এডুকেশন ফান্ড (এআইইএফ) এর ২০১৯ সালের ট্যাক্স ফাইলিং এর অসংশোধিত কপি। ছবি: ইন্টারসেপ্ট

ইন্টারসেপ্ট প্রাপ্ত ওই নথি অনুসারে, এআইপিএসি মোট আটটি জনহিতৈষী গোষ্ঠী, এস্টেট এবং পারিবারিক ফাউন্ডেশন থেকে লাখ লাখ ডলার পেয়েছে। সেগুলো হলো, কোরেট ফাউন্ডেশন, সোয়ার্টজ ফাউন্ডেশন,জুইশ কমিউনাল ফান্ড, ওয়ানএইট ফাউন্ডেশন, চার্লস অ্যান্ড লিন শুস্টারম্যান ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন, পল ই. সিঙ্গার ফাউন্ডেশন, মিল্টন কুপার ২০১৩ রিভোকেবল ট্রাস্ট এবং এস্টেট অব হেডি অরডেন।

পাবলিক রেকর্ড ডাটাবেস লেজিস্টর্ম-এর তথ্য অনুসারে, এই দাতারা ২০১৯ সালে ইসরায়েলে এআইইএফ-এর স্পন্সর করা ১২৯টি সফরে আর্থিক সহায়তা হিসেবে মোট ২১ লাখ ২০ হাজার ডলার দিয়েছে।

জুন মাসে ওয়াশিংটনে এআইপিএসির অনুষ্ঠানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। ছবি: রয়টার্স

রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের ইসরায়েলের পক্ষে সমর্থন দৃঢ় রাখতে এআইপিএসি’র অর্থায়নে এই সফরগুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে ইন্টারসেপ্ট। সম্প্রতি ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় বাইডেন প্রশাসন এবং কংগ্রেসের বেশিরভাগ সদস্যের সমর্থন এ বিষয়টিকে আরও পরিষ্কার করে দিয়েছে বলে মনে করছে তারা। এই রিপোর্ট প্রকাশ করা পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আগ্রাসনে ১২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে নিহত হওয়ার তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে। যদিও সোমবার তা ১৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

ইসরায়েলে কংগ্রেস নেতাদের সফরের বিষয়ে আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির প্যালেস্টাইন/ইসরায়েল প্রোগ্রামের প্রধান ইউসেফ মুনায়ার ইন্টারসেপ্টকে বলেছেন, ‘ইসরায়েলের পক্ষে সমর্থন জোগাতে এসব সফর কংগ্রেসে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। কেননা, ইসরায়েলে ব্যক্তিগত সফরের কারণে এসব কংগ্রেস নেতাকে প্রায়ই ইসরায়েলপন্থি নীতিকে সমর্থন করতে দেখা যায়। এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ রাখার কৌশলের অন্যতম একটি অংশ।’

এক বিবৃতিতে, এআইপিএসি’র মুখপাত্র মার্শাল উইটম্যান ইন্টারসেপ্টকে জানিয়েছেন, ‘এআইপিএসি এবং এআইইএফ সম্পূর্ণ আলাদা দুটি সংস্থা এবং তারা কঠোরভাবে সব প্রাসঙ্গিক সরকারি নির্দেশিকা, রেজুলেশন এবং আইন মেনে চলে।’

২০১৩ সালে এআইপিএসি সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ছবি: রয়টার্স

ইন্টারসেপ্ট আরও জানিয়েছে, এআইইএফ এবং ট্যাক্স নথির দাতা হিসেবে তালিকাভুক্ত ফাউন্ডেশনগুলোকে এ বিষয়ে মন্তব্য করার অনুরোধ করে ইমেইল পাঠানো হয়। তবে এআইইএফ বা তালিকাভুক্ত ফাউন্ডেশনগুলোর কেউই সেসব মেইলের জবাব দেয়নি।

ইসরায়েল ইস্যুতে কংগ্রেসে সর্বদলীয় সমর্থন নিশ্চিত করার এআইপিএসি’র লক্ষ্য বাস্তবায়নে লাখো ডলার পায় এআইইএফ। লেজিস্টর্মের তথ্য অনুসারে, এআইইএফ ২০১৯ সালে ৬৪ জন ডেমোক্র্যাট ও ৬৫ জন রিপাবলিকান নেতার ইসরায়েল সফরের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। পৃথক ১৪টি তারিখে এসব সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সফরে এক ব্যক্তির পেছনে ব্যয় হয় ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত। কংগ্রেস সদস্যরা তাদের সিনিয়র কর্মী, জীবনসঙ্গী বা সন্তানদের সঙ্গে নিতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের দুর্নীতি দমন আইন অনুসারে, লবিং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে রাজনীতিকদের বিদেশ সফরে নিয়ে যাওয়া বেআইনি। কিন্তু এআইপিএসির কৌশলের কারণে আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে এই ব্যয়কে বৈধ রাখা হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক লবিং প্রতিষ্ঠান জ্যাক আব্রামফকে ঘিরে একটি বড় ধরনের কেলেঙ্কারি হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি রাজনীতিকদের প্রভাবিত করতে দামি উপহার ও বিদেশে ভ্রমণ করিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য অনেস্ট লিডারশিপ অ্যান্ড ওপেন গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট আইনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

২০১৯ সালে ইসরায়েল সফরে কংগ্রেসের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট নেতারা। ছবি: টাইমস অব ইসরায়েল

১৯৯০ দশকের শুরু থেকে এআইপিএসি কংগ্রেশনাল সফর আয়োজন করে আসছিল। অনেস্ট লিডারশিপ আইনটি ২০০৭ সালে প্রবর্তন করা হয়। আইনটির ৫০১(সি)(৩) ও ৫০১(সি)(৪) ধারাকে কাজে লাগিয়ে তারা দুর্নীতির অভিযোগ এড়াতে পারছে। এই ধারায় ‘সমাজকল্যাণমূলক’ সংগঠনগুলোকে তাদের মোট সম্পদের ২০ শতাংশ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় লবিংয়ে ব্যয় করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

জনস্বার্থের পক্ষে কাজ করা সংগঠন পাবলিক সিটিজেন-এর সরকারি নৈতিকতা ও প্রচার তহবিল বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রেইগ হলম্যান বলেছেন, এআইপিএসি লবিং ব্যবস্থা সংস্কারকে ক্ষুণ্ন করছে। তিনি বলেন, এআইপিএসি সফলভাবে ৫০১(সি)(৩) ধারার ব্যতিক্রমকে কাজে লাগিয়েছে। এআইইএফকে কাজে লাগিয়ে কংগ্রেস সদস্যদের ইসরায়েল সফরে অর্থায়ন করতে পারছে তারা। অন্যথায় এসব সফর বেআইনি হিসেবে বিবেচিত হতো।