সবাই ‘প্রত্যয়ী’ হবো না কেন

১৩ মার্চ সর্বজনীন পেনশন স্কিম প্রত্যয় ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে স্ব-শাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে যোগদানকৃতদের বাধ্যতামূলক এই পেনশনের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশে চার শতাধিক এরূপ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পেনশন স্কিম প্রত্যয়ের প্রজ্ঞাপন জারির পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তা প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দেন। এরপর বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের নেতৃত্বে তিন মাসেরও অধিক সময় ধরে বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে আসছে। সরকার কিংবা কোনও পক্ষ থেকেই এ বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ না নেওয়ায় শিক্ষকগণ গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি অনুসরণ করে ধারাবাহিকভাবে অবস্থান কর্মসূচি, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান, ১ ঘণ্টা কর্মবিরতি, তারপর ২ ঘণ্টা কর্মবিরতি, অর্ধদিবস কর্মবিরতি ও পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেন। ৩০ জুনের মধ্যে প্রত্যয় প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা না হলে ১ জুলাই থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়।  

‘অল কোয়াইট অন দ্য গভর্নমেন্ট ফ্রন্ট’। বাধ্য হয়ে শিক্ষকগণ ১ জুলাই থেকে  সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করছেন। প্রত্যয় স্কিমকে সর্বজনীন বলা হলেও এটি সর্বজনীন নয়, প্রত্যয়ও নয়। প্রত্যয় শব্দের আভিধানিক অর্থ নিশ্চয়তা, প্রতীকী, বিশ্বাস। প্রত্যয় স্কিম নিয়ে আমার কয়েকটি জিজ্ঞাসা-

এক. পেনশন স্কিম প্রত্যয় কি নিশ্চয়তা, না অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে? দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি অনুসরণ করে আন্দোলনের শেষ ধাপে এসে সর্বাত্মক কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করছেন। এটি বিশ্বাস বা প্রতীকী সৃষ্টি করা দূরে থাক, অষ্টম বেতন কাঠামোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে যে অবমাননা-বঞ্চনা ও অন্যায় আচরণ করা হয়েছিল এবং সুপার গ্রেড প্রদান করা নিয়ে যে প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করা হয়েছিল, তারই পুনরাবৃত্তি লক্ষণীয়।

৭ম বেতন স্কেলে  মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পরেই ছিল সচিবদের বেতন (গ্রেড-১)। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা এই সচিবের সমমানের পে-স্কেল অর্থাৎ গ্রেড-১ স্কেলে বেতন পাওয়ায় তাদের বেতন ও মর্যাদা উভয়ই মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পরে ছিল। কিন্তু ৮ম পে-স্কেলে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পরে সিনিয়র সচিব পদ সৃষ্টি এবং তাদের বেতন সচিবদের ওপরে থাকায় এবং পদায়িত ও ওএসডি সচিবের মধ্যে বিভাজন করায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদায় তিন ধাপ অবনমন হয়। যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদারও অবনমন হয়। শিক্ষকগণ এই অবনমন ও অবমাননার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। কালো ব্যাজ ধারণসহ নানা আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আমলাতন্ত্রের শিক্ষকবিদ্বেষী অংশটি কোনও সমঝোতার বিরুদ্ধে অনড় অবস্থান গ্রহণ করেন। এমন অবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যার হস্তক্ষেপে সুরাহা হয় যে শিক্ষকরা সচিবের জন্য নির্ধারিত গ্রেডে বেতন পাবেন। আরও সিদ্ধান্ত হয় কিছু সিনিয়র শিক্ষক সিনিয়র সচিবের জন্য নির্ধারিত সুপার গ্রেডে বেতন ভাতা পাবেন। সেই থেকে ৭ বছর হতে চললো।

শিক্ষকদের জন্য সুপার গ্রেড চালু করা হয়নি। তার মানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন কাঠামো এখনও ৭ম পে-স্কেলের তুলনায় দুই গ্রেড নিচে। সচিব মহোদয়গণ সিনিয়র হতে পারলেও অধ্যাপকগণ সিনিয়র হতে পারেননি। তারা নাবালকই রয়ে গিয়েছেন। অধ্যাপকদের নাবালক রেখে শিক্ষার সাবালকত্ব অর্জন করা যাবে কি? শিক্ষকের মানহানি করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাবে কি? জনপ্রশাসনে উপসচিব হলে গাড়ি ক্রয়ের জন্য ৪০ লাখ টাকা পাবেন। তার মধ্যে ৩০ লাখ অফেরতযোগ্য। আর ১০ লাখ সুদবিহীন ফেরতযোগ্য। গাড়ি পরিচালনার জন্য মাসিক ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ। আর একজন সহকারী অধ্যাপকের মূল বেতন (বেসিক পে) ৩৫,৫০০ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসাবে যোগদানের ন্যূনতম তিন বছর পর গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশনা সাপেক্ষে একজন শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক হিসেবে আবেদন করার যোগ্যতা অর্জন করেন। তার মানে একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার পর কয়েক বছর চাকরি করে যে মূল বেতন প্রাপ্য হন তা একজন উপসচিবের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত ব্যয়ের চেয়েও ৪,৫০০ টাকা কম।

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ গণপরিষদে খসড়া শাসনতন্ত্র অনুমোদনের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু যে বক্তৃতা করেন সেখানে প্রশাসনের প্রভুত্ববাদী চরিত্রের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতায় বলেন, “কেউ কেউ বলেছেন যে সরকারি কর্মচারীদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীরা একটি আলাদা জাতি নয়। তাঁরা আমাদের বাপ, আমাদের ভাই। তাঁরা কোনও ভিন্ন শ্রেণি নন। ইংরেজ আমলে আইসিএস, আইপিএসদের প্রটেকশন দেওয়া হতো। সেই প্রটেকশন পাকিস্তান আমলেও দেওয়া হতো। আমলাতন্ত্রের সেই প্রটেকশনের ওপর আঘাত করেছি, অন্য জায়গায় আঘাত করিনি। এই শ্রেণি রাখতে চাই না, কারণ শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই, শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আইনের চোখে সাড়ে সাত কোটি মানুষের যে অধিকার, সরকারি কর্মচারীদেরও সেই অধিকার। মজদুর-কৃষকদের টাকা দিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মাইনে, খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করা হয়। মজদুর-কৃষকদের যে অধিকার, সরকারি কর্মচারীদের সে অধিকার থাকবে। এর বেশি অধিকার তাঁরা পেতে পারেন না। সরকারি কর্মচারীদের মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে যে তাঁরা শাসক নন, সেবক। সাম পিপল কেইম টু মি অ্যান্ড ওয়ান্টেড প্রটেকশন ফ্রম মি। আই টোল্ড দেম, মাই পিপল ওয়ান্ট প্রটেকশন ফ্রম ইউ জেন্টলম্যান।… বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছে। কেউ পঁচাত্তর টাকা বেতন পাবে, কেউ দুই হাজার টাকা বেতন পাবে তা হতে পারে না। সকলের বাঁচবার মতো অধিকার থাকতে হবে। একজন সবকিছু পাবে, আরেকজন পাবে না, তা হতে পারে না। সম্পদ ভাগ করে খেতে হবে।”

ভারত সরকার মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় টানতে বেতন কাঠামোতে সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি ও উপযুক্ত মর্যাদা প্রদানের ব্যবস্থা করেছেন। ভারতের ষষ্ঠ বেতন কমিশনের সুপারিশে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছে “Teachers in various categories should be given incentives by way of advance increments and higher grade pay to compensate them for higher qualifications at the entry point. Also, it would be a significant incentive for more meritorious scholars to join the teaching profession, particularly at this juncture when both the corporate sector and foreign educational institutions are luring the young talented persons away with higher salaries and better pay packages”.

ভারতের বেতন কমিশন মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে ও শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধিতে অবস্থান নিয়েছে। আর বাংলাদেশের ৮ম বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ‘তবে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।’

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর কথা বলা হলেও ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় যতদিন স্বাবলম্বী না হবে, ততদিন স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রদান করা যুক্তিযুক্ত হবে না। ভারত মেধাবীদের শিক্ষকতায় টানতে ষষ্ঠ বেতন কমিশনের সুপারিশকৃত উচ্চতর বেতন ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মধ্যেই সীমিত থাকেনি। সপ্তম বেতন কমিশনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ৩০-৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা ২০২৩ সাল থেকে কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশের কাছাকাছি কিংবা বাংলাদেশের চেয়ে কম জিডিপির দেশ পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা, কাজাখিস্তান, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, ব্রাজিল যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর আওতায় আমাদের চেয়ে ৪ থেকে ১২ গুণ বেশি বেতন দিতে পারে, বাংলাদেশে কেন নয়?

এসব অনেক দেশ কেবল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেলই নয়, নিজ দেশের প্রবাসী প্রখ্যাত অধ্যাপকদের আকৃষ্ট করতে দেদার অর্থ বিনিয়োগ করছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নাই যে শিক্ষকতা পেশা বাদে বেশ কিছু পেশায় নানারূপে-আকৃতিতে স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের সুযোগ-সুবিধা চালু রয়েছে। নামমাত্র বা প্রতীকী মূল্যে প্লট, ফ্ল্যাট, খাদ্যসামগ্রী, স্বাস্থ্যসেবা, নানা নামে ভাতা, উচ্চহারে সিটিং অ্যালাউন্স, গাড়ি ক্রয়ের জন্য বিনা সুদে ঋণ সুবিধা, যার সিংহভাগই অফেরতযোগ্য, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসিক ৪০ হাজার টাকাসহ নানা প্রান্তিক সুবিধাদি প্রদানের মাধ্যমে বেশ কিছু সরকারি চাকরিতে ছদ্মরূপে স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো চালু রয়েছে। সচিবালয়ে বসে যারা শিক্ষা ও শিক্ষকবিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তারা ভেবে দেখেছেন কি, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়াসহ এশিয়ার অনেক দেশের শিক্ষার্থীরা একসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আসতো। আর আজ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ অনেকেই সেসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি অর্জন করতে যাচ্ছেন।

এ দায় কার? নব্বইয়ের দশকেও বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মাথাপিছু দেশজ উৎপাদন দুই হাজার ডলার সীমার মধ্যে ছিল। আর এখন পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে মালয়েশিয়ার মাথাপিছু দেশজ উৎপাদন ১১ হাজার ৭০০ ডলার ও থাইল্যান্ডের ৭ হাজার ৮০২ ডলার। আর গত বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু দেশজ উৎপাদন ছিল ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। বাংলাদেশকে এত পিছনে ফেলায় কোনও ম্যাজিক নেই। এসব দেশের শিক্ষার পিছনে বিনিয়োগের দিকে তাকালেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।

দুই. ২০১৮ সালে ফরাসউদ্দিন বেতন কমিশনের সুপারিশকে অজুহাত হিসাবে ধরে শিক্ষকদের বেতন-ভাতাদি কয়েক ধাপ কমানো হয়েছিল। আর এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি জনবান্ধব সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিকে অপব্যবহার করে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা পেনশনকে বাতিল করে শিক্ষকদের জন্য তথাকথিত প্রত্যয় স্কিম চাপিয়ে দেওয়া হলো। সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর মূল দর্শনটি ছিল সরকারি কোষাগার থেকে বেতন ভাতা পান না এমন মানুষ, যেমন- বেসরকারি চাকরিজীবী, প্রবাসী, স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের নিরাপত্তার জন্য এই পেনশন ব্যবস্থা।

সর্বজনীন পেনশন স্কিম ঘোষণা করার সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “যারা সরকারি চাকরিজীবী তারা তো পান পেনশন। কাজেই এটা সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য না। যারা সরকারি বেতন পাবেন, সরকারি পেনশন পাবেন, তাদের জন্য এটা প্রযোজ্য হবে না। এর বাইরে যে জনগোষ্ঠী, শুধু তাদের জন্য এ ব্যবস্থাটা আমরা করে দিচ্ছি। যাতে করে তারাও একটু সম্মানজনকভাবে বাঁচতে পারে।” অথচ এখন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়েছে, বর্তমানে ৪০৩টি স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের মধ্যে ৯০টির মতো প্রতিষ্ঠানে পেনশন ব্যবস্থা চালু আছে। বাকি ৩১৩টি প্রতিষ্ঠানে চালু রয়েছে কন্ট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড (সিপিএফ)। সিপিএফ সুবিধার আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এককালীন আনুতোষিক পেয়ে থাকেন, পেনশন পান না। ৩১৩টি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনের আওতায় আনতে প্রত্যয় স্কিম চালু করা হয়েছে। যারা পান না তাদের জন্য চালু করা খুবই যৌক্তিক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যারা পাচ্ছেন তাদের কেন জোর করে ওই দলে শামিল করতে হলো?

তিন. অর্থমন্ত্রী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন যোগদানকারী সরকারি কর্মচারীরাও সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আসবেন। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদেরও সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনতে অসুবিধা কি? স্ব-শাসিত, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত ৩১৩ প্রতিষ্ঠানের যারা পেনশন পান না তাদের সঙ্গে শিক্ষকদের যুক্ত করে তড়িঘড়ি প্রত্যয় চালু মানে ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’।

চার. ২০২৫ সালের জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনাময় স্কিমের নাম হবে ‘সেবক’। রাষ্ট্র পরিচালনায় কান্ডারির ভূমিকা রাজনীতিবিদদের। একটি জনগোষ্ঠীর স্বপ্নের ঠিকানা নির্ধারণ, নীতি-কৌশল ও বিধান প্রণয়নের দায়িত্ব রাজনীতির। এসব নীতি-কৌশল আর বিধান বাস্তবায়ন করে স্বপ্নকে তার ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নানান কিসিমের শ্রেণি-পেশার বিশাল এক কর্মী বাহিনীর ওপর। রাষ্ট্র ও জনগণের খাদেম নামে পরিচিত এরা। এমনি দুটো পেশা শিক্ষকতা ও বেসামরিক প্রশাসন। শিক্ষা কি সেবা নয়? যদি সেবা হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা ‘সেবক’ স্কিমের আওতাধীন হবেন না কেন?

প্রত্যয় স্কিম চালুর আগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারী যারা একই গ্রেডে বেতন-ভাতা পেতেন পেনশনের ক্ষেত্রেও তাদের জন্য একইরূপ আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা প্রচলিত ছিল। এখন কেন ভিন্ন নামে দলভুক্ত হবো? পেনশন স্কিম পরিবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিয়েই কেন শুরু করতে হবে? সরকারি কোষাগার থেকে বেতন পাওয়া সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে শুরু করতে অসুবিধা কোথায়? একই কোষাগার থেকে বেতন নিয়ে এক দলের জন্য ‘প্রত্যয়’ আর অন্য দলের জন্য ‘সেবক’ কেন? ‘প্রত্যয়’ যদি ভালো হয় তা সবার জন্য নয় কেন? নাগরিকদের মধ্যে এমন বৈষম্য ও বিভাজন সৃষ্টির জন্য কি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল?

চার. প্রত্যয় সর্বজনীন কীভাবে হবে? সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য স্কিম সেবক কেবল নামে পরিবর্তন হবে বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। বেতন স্কেল নিয়ে যে তেলেসমাতি করা হয়েছে তাতে ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাবে এটাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন ভাতা নেওয়া রাষ্ট্রের ‘খাদেম’দের জন্য পেনশনের ভিন্ন ভিন্ন স্কিম সর্বজনীন নয়, এটি ‘বিভাজনীন’।

ছয়. ব্যাটারি-সিএনজি চালিত রিকশা, বাস-ট্রাক সমিতি দাবি-দাওয়ার জন্য আন্দোলন করলে সরকারের তরফ থেকে দ্রুত আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অথচ চার মাস হতে চললো শিক্ষকদের আন্দোলন, কোনও উদ্যোগ নেওয়া হলো না। একশ্রেণির সরকারি চাকরিজীবী ক্রমেই শিক্ষকদের অচ্ছুত-অস্পৃশ্য বানিয়ে ফেলছেন। বিসিএসের ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে শিক্ষকদের কী দুরবস্থা তা বোধ করি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যারা পরিকল্পিতভাবে সরকারের মুখোমুখি করে দিলেন, তারা আর যাই হোক শিক্ষক ও শিক্ষাবান্ধব কি?
শিক্ষাকে অবহেলা করে দেশকে ভালোবাসা যায় কি?

সাত. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় একটি আকর্ষণীয় আর্থিক সুবিধা ছিল চাকরি শেষে আনুতোষিক হিসেবে এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ প্রাপ্তি। প্রত্যয় স্কিমের নামে সেটাও কেড়ে নেওয়া হলে মেধাবীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে যেতে চাইবে কেন?

বেশ কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া থেকে পিএইচডি করে যোগদান করলে এন্ট্রি লেভেলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ৫-১০ গুণ বেশি বেতন দেওয়া হয়। আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র অধ্যাপক এক বছরে যে বেতন পান তা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একই মানের অধ্যাপককে বেতনের মাধ্যমে ওই পরিমাণ অর্থ রোজগার করতে ন্যূনতম ৫-১০ বছর চাকরি করতে হবে।

উচ্চ বেতনের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি অনেক মধ্যম সারির বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় ৩-৫ গুণ বেশি বেতন দিচ্ছে। আগে সরকারি চাকরি ছাড়া পেনশনের ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু সর্বজনীন পেনশন চালু হওয়ায় মাসিক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রেখে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণও পেনশন সুবিধার সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কয়েকটি ইতোমধ্যে বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। অনেকগুলো র‌্যাংকিংয়ে অন্তর্ভুক্তির উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। পেনশনের চলমান সুযোগ-সুবিধাটুকুও কেড়ে নেওয়া হলে মেধাবী শিক্ষকরা কেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন?

আট. দুর্বল বেতন কাঠামো আর অসম্মানজনক অবস্থানের কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শিক্ষকতায় আসতে চাইছেন না। অনেকে পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন কিংবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করছেন। আবার অনেকে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের বেতন আর সম্মানের কথা বিবেচনা করে বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি শেষে দেশেই ফেরেন না। এভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমাগত মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে। একটা সময় আসবে যখন কেবল যাদের সুযোগ নাই তারাই হয়তো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়ে যাবেন। আমরা জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করার ফাঁকা আওয়াজ তুলি, কিন্তু সেই জনসম্পদ তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ক্রমাগত অবহেলা করে আসছি। এভাবে টেকসই উন্নয়ন ও অগ্রগতি সম্ভব হবে কি? যেসব দেশ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে প্রভূত উন্নতি করেছে, তারা শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। উদার হস্তে বিনিয়োগ করেছে। এশিয়ায় চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী চলচ্চিত্র হীরক রাজার দেশে। ছবিতে রাষ্ট্রযন্ত্র শিক্ষকের ছাত্র পড়ানো বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন এই বলে যে ‘যত বেশি জানে, তত কম মানে; এবং ‘জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই’। একালে হীরক রাজা নেই। তবে তার চেতনার ধারকেরা রয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে অন্য অনেক কিছুর মতো লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে শিক্ষার কদর আর শিক্ষকের সম্মান। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম বছরগুলোতে সরকারের কোষাগারের অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। কিন্তু সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু শিক্ষকদের জন্য মোটামুটি সম্মানজনক বেতন-ভাতা নিশ্চিত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে হীরক রাজার ধারক-বাহকেরা। আজ এরা অনেক শক্তিশালী। শিক্ষা ও শিক্ষককে চরম অবমাননার জায়গায় ঠেলে দিতে পারে এ চক্র অবলীলায়। সবকিছুর পরও আন্দোলনরত শিক্ষকরা এই আশায় বুক বেঁধে আছেন, বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও আদর্শের উত্তরাধিকারী বঙ্গবন্ধুকন্যা শিক্ষকদের অবমাননা, বঞ্চনার অবসান ঘটাবেন। কেড়ে নেওয়া সুবিধা ফিরিয়ে দিবেন।

তারপরও যদি প্রত্যয় স্কিম প্রণেতারা নতুন পেনশন ব্যবস্থাকে আগের চেয়ে ভালো বলে অভিহিত করেন, তাহলে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা প্রত্যয় স্কিম গ্রহণ করে ‘প্রত্যয়ী’ হবে কেন? সরকারি কোষাগার থেকে আমরা যারা বেতন-ভাতা নিই, আমরা সবাই ‘প্রত্যয়ী’ হবো না কেন?

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: [email protected]