অসহায় মানুষের ত্রাণ গেলো ১৮০ বড় লোকের ঘরে

কুড়িগ্রাম সদরের বেলগাছা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হরিরাম গ্রাম। বন্যামুক্ত এই গ্রামের বাসিন্দা হায়দার আলী। পাকা রাস্তার সঙ্গে সেমিপাকা কয়েকটি দালান ঘর নিয়ে বাড়ি। বড় ছেলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। ছোট ছেলে সেনাবাহিনীর সদস্য। স্বাবলম্বী পরিবারের অভিভাবক হায়দার আলী বন্যাদুর্গতদের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ সহায়তা পেয়েছেন। ইউনিয়নের ‘বন্যাকবলিত পরিবারের অগ্রাধিকার তালিকায়’ তার নাম ১৫৪ নম্বরে রয়েছে। অথচ এই ত্রাণ পাওয়ার কথা বন্যাদুর্গত অসহায় মানুষের।

একই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পলাশবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক। দুই ছেলে গোলজার ও রিপন মিয়া গাড়িচালক। কয়েক শতক জমির ওপর উঁচু ভিটায় সেমিপাকা দালান ঘর। সামর্থ্যবান রাজ্জাক ও তার দুই ছেলে বন্যাকবলিতদের জন্য বরাদ্দের ত্রাণ পেয়েছেন। তালিকায় তাদের নাম ১২১, ১২২ ও ১২৩ ক্রমিকে আছে।

একই গ্রামের বাসিন্দা শ্রমিক সরদার নুর আমিন। গত বছর গ্রামের ভেতরে পাকা সড়কের সঙ্গে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে জমি কিনেছেন। সেই জমিতে সবজি চাষ করেছেন। বাড়িতে টিনের ঘর। বন্যা কিংবা জলাবদ্ধতার কোনও ছাপ নেই। তালিকায় ৯০ নম্বর ক্রমিকে তার নাম। তিনিও পেয়েছেন বন্যাকবলিতদের ত্রাণ। এই ইউনিয়নে বন্যাকবলিতদের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন আরও কয়েকজন সামর্থ্যবান, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী। এমনকি যাদের বাড়িতে পাকা দালান এমন পরিবারের সদস্যরা পেয়েছেন বানভাসিদের জন্য বরাদ্দের খাদ্য সহায়তা। অথচ ইউনিয়নটি বন্যাকবলিত হয়নি।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কুড়িগ্রামের ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের উপ-সহকারী প্রকৌশলীর গাড়িচালক মো. মুকুল। পলাশবাড়ি গ্রামের এই বাসিন্দাও পেয়েছেন বানভাসিদের জন্য বরাদ্দের ত্রাণ।

বেলগাছা ইউনিয়নে বন্যার কোনও ছায়া নেই। ইউনিয়নটির আশপাশে নদ-নদীও নেই। ছোট-বড় যেকোনও বন্যা জেলায় আঘাত করলেও এটি থাকে সবসময় নিরাপদ। এমনকি ২০১৭ সালে ধরলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে সদরের যে কয়েকটি ইউনিয়ন বন্যার কবলে পড়েছিল, তাতেও ওই ইউনিয়ন ছিল নিরাপদ। অথচ বন্যাকবলিত পরিবারের অগ্রাধিকার তালিকায় ইউনিয়নের ১৮০ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তালিকায় থাকা ইউনিয়নের বেশিরভাগ পরিবার স্বাবলম্বী ও সামর্থ্যবান। তাদের কোন বিবেচনায় বন্যাকবলিতদের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তালিকায় স্থান পাওয়া ১০০ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে আব্দুর রহিমের নাম। ত্রিমোহনী বাজার সংলগ্ন মসজিদের ঠিক উত্তরে কুড়িগ্রাম-রাজারহাট সড়কের সঙ্গে তার বাড়ি। বাড়ির সামনে চারটি দোকান ভাড়া দেওয়া। সেমিপাকা ঘরের বাড়ি লাগোয়া কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি আছে রহিমের। অথচ তিনিও ‘বন্যাকবলিত’।

বেলগাছা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের তিনবারের সাবেক সদস্য (মেম্বার) আব্দুল আজিজ ব্যাপারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইউনিয়নে যেসব পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই সচ্ছল এবং কর্মক্ষম। অনেক অসচ্ছল ও দুস্থ পরিবার বঞ্চিত হয়েছে। সরকারকে বিতর্কিত করতে কে বা কারা এই তালিকা করেছেন, তা আমার জানা নেই।’

উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, বেলগাছা ইউনিয়নে এক মেট্রিক টন চাল ও ৮০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর থেকে ১৮০ পরিবারের মাঝে এসব বরাদ্দ বিতরণ করা হয়।

বেলগাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিটন মিয়া বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে বন্যা নেই। তবে ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে যাওয়া একটি নালার পাশে বসবাসকারী কিছু পরিবারে জলাবদ্ধতা রয়েছে। তবে সে সংখ্যা কম। একইভাবে কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন বন্যাকবলিত না হলেও সেখানেও এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে।’

বন্যাকবলিত না হয়েও কীভাবে ত্রাণ পেলো এবং স্বাবলম্বী ও সামর্থ্যবানরা কীভাবে তালিকায় ঢুকলেন এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, ‘তালিকাটি উপজেলা পরিষদ থেকে করেছে। আমি শুধু বিতরণকারী।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুসফিকুল আলম হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধ দিনমজুর পরিবারের কথা বিবেচনায় নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের পরামর্শে বেলগাছা ইউনিয়নে এক মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে আর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তবে ওই তালিকায় স্বাবলম্বী ও সামর্থ্যবান পরিবারের নাম থাকার বিষয়টি আমার জানা নেই।’

দোকানঘর সংযুক্ত বসতবাড়ি ত্রিমোহনী বাজার সংলগ্ন আব্দুর রহিমের, বন্যায় আক্রান্ত না হয়েও ত্রাণ সহায়তা পেয়েছেন

একদিকে বেলগাছায় স্বাবলম্বী ও সামর্থ্যবানদের ত্রাণ দেওয়া হয়েছে আরেকদিকে চিলমারী উপজেলায় ত্রাণ সহায়তার জন্য উপজেলা পরিষদ ঘেরাও করেছেন বাসভাসিরা। বুধবার (১০ জুলাই) দুপুরে উপজেলার থানাহাট, রমনা ও রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কয়েকশ বানভাসি পরিবার পরিষদ চত্বরে ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভ করে। পরে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রুকুনুজ্জামান শাহিনের আশ্বাসে পরিষদ চত্বর ত্যাগ করে তারা।

চেয়ারম্যান রুকুনুজ্জামান শাহিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম তীরবর্তী কয়েকশ পানিবন্দি পরিবার খাদ্য সহায়তার দাবি নিয়ে এসেছিলেন। আমি তাদের আশ্বাস দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছি। জেলা প্রশাসককে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।’

বেলগাছা ইউনিয়ন বন্যাকবলিত না হয়েও ত্রাণ পাওয়া এবং সামর্থ্যবানদের সহায়তা দেওয়ার খবর শুনে উষ্মা প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ। পাশাপাশি চিলমারী ইউনিয়নে পানিবন্দি পরিবারের জন্য আরও ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার কথা জানান তিনি।

জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা সূত্র জানায়, চলমান বন্যায় জেলায় ৫৫ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভা এলাকার ৩৬ হাজার ৯২৫ পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে বুধবার পর্যন্ত ৫৪২ মেট্রিক টন চাল ও ২৩ হাজার ১২০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।